নেপাল-চীনে বন্যায় নিখোঁজ প্রায় ৩ হাজার, সুড়ঙ্গে উদ্ধার অভিযান চলছে

অনলাইন ডেস্ক : হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের কয়েক দিন পরও নেপাল ও চীনে হাজার হাজার নিখোঁজ মানুষকে উদ্ধারে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা।

গত বুধবার প্রবল স্রোতের সঙ্গে বরফ, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের সুনামির মতো ঢেউয়ে পুরো গ্রাম ভেসে যাওয়ার পর এ উদ্ধার অভিযান চলছে।

খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।

দুই দেশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার। এখন পর্যন্ত ৬৮২ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। কিছু মরদেহ নেপালের নদীর স্রোতে ভেসে ভারতের অনেক দূরের এলাকাতেও পৌঁছে থাকতে পারে বলে খবর পাওয়া গেছে।

শনিবার রাতে উদ্ধার অভিযানে বেশ অগ্রগতি হয়েছে। নেপালি সেনাবাহিনী ত্রিশুলি-৩ এ জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি সুড়ঙ্গে পাইপ ঢোকাতে সক্ষম হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, সেখানে বেশ কয়েকজন শ্রমিক আটকা পড়েছেন।

নেপালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুদান গুরুং এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে ওই ছোট ছিদ্র দিয়ে সুড়ঙ্গের ভেতরে বাতাস পাঠানো শুরু করেছি। এখন খননকাজ শুরু করা হবে এবং উদ্ধারকারী দলকে ভেতরে পাঠানো হবে।’

ত্রিশুলি-৩ এ ও ৩ বি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের সুড়ঙ্গে এখনও ১০০ জনের বেশি শ্রমিক জীবিত অবস্থায় আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। উদ্ধারকাজে এসব এলাকাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, বুধবার নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধসে ভয়াবহ এই পানির স্রোত ও বন্যার সৃষ্টি হয়।

হিমবাহ ধসের সঠিক কারণ এখনও স্পষ্ট নয়। তবে বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহ দ্রুত গলে যাচ্ছে। ফলে এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে।

জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক প্রধান সাইমন স্টিয়েল এক বিবৃতিতে বলেন, ‘হঠাৎ হিমবাহ ধস ও আকস্মিক বন্যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পাহাড়ি পরিবেশ কতটা নাজুক।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এটাও জানি, বিপুল পরিমাণ কয়লা, তেল ও গ্যাস পোড়ানোর ফলে জলবায়ু উষ্ণ হচ্ছে। এর ফলে এ ধরনের ভয়াবহ দুর্যোগের আশঙ্কা, ঘনঘন সংঘটিত হওয়ার প্রবণতা এবং ক্ষয়ক্ষতির মাত্রাÑসবই বাড়ছে। আর এসব দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীগুলো।’

‘কিছুই অবশিষ্ট নেই’

নিখোঁজ স্বজনদের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা জানার জন্য উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করছেন তাদের পরিবারের সদস্যরা। একই সঙ্গে অনেক মানুষকে শূন্য থেকে নতুন করে জীবন শুরু করার প্রস্তুতিও নিতে হচ্ছে।

নেপালের নুওয়াকোট জেলার বাসিন্দা বুদ্ধি রাম দাঙ্গোল বলেন, ‘নদীর আশপাশের সব বসতিই ভেসে গেছে। কিছুই অবশিষ্ট নেই।’

বিদুরে উদ্ধার অভিযানের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত একটি সেনা ঘাঁটিতে স্বজনরা উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের তালিকা দেখতে ভিড় করেন।

কালকা শারদা নামের এক ব্যক্তি মরিয়া হয়ে তালিকায় ছেলের নাম খুঁজছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি এখানে আমার ছেলেকে খুঁজতে এসেছি। সে জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে শ্রমিক হিসেবে কাজ করত। কিন্তু তালিকায় তার নাম পাচ্ছি না, আর কর্তৃপক্ষও কিছু বলছে না।’

বড় বড় বিদ্যুৎ অবকাঠামো প্রকল্প থাকা ওই এলাকায় নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের হিসাবে নিখোঁজদের মধ্যে ৯৩৩ জন জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের শ্রমিক রয়েছেন। এছাড়া নিখোঁজ রয়েছেন ৫১৭ জন বিদেশি, যাদের মধ্যে পর্যটক, পর্বতারোহী এবং তিব্বতের পবিত্র কৈলাস পর্বতে যাওয়া হিন্দু তীর্থযাত্রীরাও রয়েছেন।

ভারতীয় ধর্মগুরু সদগুরুর নেতৃত্বাধীন ইশা ফাউন্ডেশন শনিবার ইনস্টাগ্রামে জানায়, তাদের ৮০ সদস্যের একটি দল ওই এলাকায় ভ্রমণে গিয়েছিল।

তাদের দলটি চীনের সীমান্তবর্তী মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত গিরং এলাকায় ছিল। ফাউন্ডেশনটি জানায়, এলাকাটি ‘পুরোপুরি পানিতে ভেসে গেছে’। সেখানে অভিবাসন দপ্তরের এলাকায় এখনও কেউ বেঁচে থাকার আশাব্যঞ্জক কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছে না বলেও জানানো হয়।

‘প্রবল মানসিক আঘাত’

যুক্তরাষ্ট্র শনিবার নেপালের জন্য ৩৬ লাখ ডলারের মানবিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এর মধ্যে জরুরি খাদ্য সহায়তাও রয়েছে। এর আগে দুর্যোগের পরপরই ওয়াশিংটন ৫ লাখ ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয় ।

নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বলেছেন, পুনর্গঠনে ব্যয় কয়েক বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে।

তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমাদের সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো উদ্ধার অভিযান চালানো এবং যতটা সম্ভব মানুষের জীবন রক্ষা করা।’

আটকে পড়া মানুষকে শনাক্ত করতে ভারী মালামাল বহনে সক্ষম ড্রোন ও আধুনিক প্রযুক্তিসহ বিশেষায়িত সহায়তার আবেদন জানিয়েছেন তিনি।

মরদেহ শনাক্ত করতে ফরেনসিক পরীক্ষার কিট এবং সেগুলো সংরক্ষণের জন্য হিমায়িত রাখার ব্যবস্থা চেয়েছেন তিনি। তার আশঙ্কা, পানিতে থাকা মরদেহ দ্রুত পচে যেতে পারে।

নিখোঁজদের সন্ধানে নতুন করে বন্যার আশঙ্কাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বরফ ও কাদা-মাটির প্রবল স্রোতে বড় বড় জলাধারের মতো হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে একটি নতুন হ্রদ থেকে আবারও বন্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

চীন ও নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা শনিবার এ বিষয়ে কথা বলেছেন। দুই পক্ষই স্যাটেলাইট ও নদী-সংক্রান্ত পানির তথ্য বিনিময়ের বিষয়ে আলোচনা করেছে।

তিব্বতে চীনা কর্তৃপক্ষই তথ্যের একমাত্র উৎস। নতুন সৃষ্টি হওয়া একটি হ্রদ থেকে ফের বন্যার আশঙ্কায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত গিরং এলাকায় উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল।

তবে চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি শনিবার রাতে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে জানায়, হ্রদটির পানি ‘প্রাকৃতিকভাবে বের হয়ে যাচ্ছে’ এবং প্রায় পুরোপুরি পানি নেমে গেছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, গিরং এলাকায় মোট ২ হাজার ১৪১ জন উদ্ধারকর্মী কাজ করছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় রয়েছেন ৫০০ জনের বেশি।

নেপাল শনিবার জানিয়েছে, দেশটিতে বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৬৭৫ জনে দাঁড়িয়েছে।

দেশটিতে এখনও ২ হাজার ৪২৬ জনের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। নিখোঁজদের মধ্যে কয়েকশ বিদেশিও রয়েছেন।

সীমান্তের ওপারে তিব্বতে বিদেশি সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার খুবই সীমিত। চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার তথ্য অনুযায়ী, সেখানে ৭ জন নিহত এবং ৫৫৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন।

তিব্বতে আটকা পড়া ৫৫৫ জন পর্যটক ও ৪৯৯ জন চীনা নাগরিককে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

এদিকে ভারতের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নেপাল থেকে প্রবাহিত নদী থেকে সাতটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এগুলো বন্যায় ভেসে যাওয়া মানুষের মরদেহ বলে ধারণা করা হচ্ছে।

‘আর কোনো আশা নেই’

নিখোঁজ স্বজনদের খবরের অপেক্ষায় থাকা অনেক পরিবারের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।

বিদুরে কালকা শারদা তার ১৮ বছর বয়সী ছেলে বিনোদ শারদার খোঁজে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের তালিকা দেখছিলেন। বিনোদ একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন।

কালকা বলেন, ‘আমার মনে হয় আর কোনো আশা নেই। কারণ সে যদি বেঁচে থাকত, তাহলে কোনো না কোনোভাবে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করত।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *