
অনলাইন ডেস্ক : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জ্বালানি খাতের সংকট মোকাবিলায় সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, আগের অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সংকট তৈরি হয়েছে। বর্তমান সরকার দেশ ও দেশের মানুষকে এই সংকট থেকে রক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্র, রাজনীতি ও প্রশাসনে ফ্যাসিবাদের সুবিধাভোগীরা বসে নেই। এই চক্র কৌশলে দেশের জ্বালানি বা বিদ্যুৎ খাতকে অস্থিতিশীল করতে বেশ সক্রিয় রয়েছে। তারা বিভিন্নভাবে সেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ খাত নিয়ে তারা নানা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে।
আজ শনিবার জাতীয় সংসদের এলডি হলে ডক্টরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত চিকিৎসক সমাবেশে তিনি এ কথা বলেন।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান জাতীয় সংসদ ভবনের এলডি হল প্রাঙ্গণে নিম ও অর্জুন গাছের চারা রোপণ করেন।
প্রধানমন্ত্রী পরে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন এবং বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে চিকিৎসক সমাবেশের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার অস্বীকার করেনি যে বর্তমানে দেশের মানুষ বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি সংকটে রয়েছে। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দিতে পূর্বে যে অপরিকল্পিত উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, তার খেসারত এখন দেশ, দেশের মানুষ ও সরকারকে দিতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, আপনারা জানেন বর্তমান সরকার একটি ভঙ্গুর অবস্থায় দেশকে পেয়েছে। নানা সংকট কাটিয়ে সেই অবস্থা থেকে উত্তরণে ইতোমধ্যে আমরা নানা কাজ শুরু করেছি। পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে যেন গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানি সংকট থেকে মানুষকে ধীরে ধীরে বের করে আনা যায়।
এর আগে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত ও মোনাজাতের মাধ্যমে চিকিৎসক সমাবেশ শুরু হয়। এ সমাবেশে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ড্যাবের নেতাকর্মী ও চিকিৎসকেরা অংশ নেন।
ড্যাব সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য দেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, ড্যাব মহাসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিল প্রমুখ।
মার্কিন উদ্ভাবক ও ব্যবসায়ী টমাস আলভা এডিসনের একটি উক্তির উদাহরণ দিয়ে তারেক রহমান বলেন, তিনি বলেছিলেন ভবিষ্যতের চিকিৎসকরা কোনো ওষুধ দেবেন না। বরং তারা রোগীদের শরীরচর্চা, সুষম খাদ্য এবং রোগ প্রতিরোধের কারণ ও উপায় সম্পর্কে সচেতন করবেন। তাঁর এ নীতির সঙ্গে বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্যনীতির মিল আছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর’ নীতিতে বিশ্বাস করে। এর অর্থ হলো ‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম’। মানে কোনো রোগ হওয়ার পরে তার সমাধান বা চিকিৎসা খোঁজার চেয়ে, তা যেন না হতে পারে সেই বিষয়ে আগে থেকেই সতর্ক থাকা দরকার।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খাতে সরকার সারাদেশে এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যারা নাগরিকদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে সতর্ক ও সচেতন করবে। তবে স্বাস্থ্যকর্মীদের যথাযথভাবে প্রশিক্ষিত করার ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের নেতৃত্ব দিতে হবে।
এ প্রসঙ্গে একটি উপলদ্ধির কথা শেয়ার করতে চাই জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থী বা পেশাজীবীগণ রাজনীতিতে সংশ্লিষ্ট থাকবেন কি না বা কতটা সম্পৃক্ত থাকবেন এ নিয়ে সচেতন মহলে আলোচনা রয়েছে। এক্ষেত্রে আমি মনে করি, একট গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেহেতু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রায় সকল কাজকেই প্রভাবিত করে, তাই শিক্ষার্থী, শিক্ষক কিংবা পেশাজীবী সবাই যার যার মতাদর্শ অনুসারে রাজনৈতিকভাবে সুসংগঠিত থাকা বা রাজনৈতিকভাবে সচেতন থাকা অযৌক্তিক নয়।
তিনি বলেন, তবে অতিমাত্রায় রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা যেন নিজেদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন ঘটার কারণ না হয়ে দাঁড়ায় সে ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকা জরুরি। প্রথাগত রাজনীতির বাইরে এসে রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি।
চিকিৎসকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং চিকিৎসা সেবাকে আরও কার্যকর ও জনবান্ধব করার লক্ষ্যে আপনাদের পক্ষ থেকে কিছু প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ, সরকারি চাকরিতে চিকিৎসকদের প্রবেশের বয়সসীমা ৩২ থেকে ৩৪ বছরে উন্নীত করা, চিকিৎসকদের অবসরের বয়সসীমা ৬১ থেকে ৬৫ বছরে উন্নীত করা।
এছাড়া চিকিৎসক এবং রোগী উভয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি সময়োযোগী স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, উপজেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মরত চিকিৎসকদের জন্য বিশেষ ভাতা ও প্রণোদনার ব্যবস্থা, বেসরকারি খাতে কর্মরত লক্ষাধিক চিকিৎসকের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ও ন্যায্য বেতন কাঠামো প্রণয়ন এবং শুধুমাত্র রাজধানীকেন্দ্রিক না রেখে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা।
তারেক রহমান বলেন, আপনাদের এসব প্রস্তাবনা অযৌক্তিক নয়। ইতোমধ্যেই শিশু হাসপাতালসহ ঢাকার বাইরে বেশ কিছু বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। অন্যান্য প্রস্তাবগুলোও ইতিবাচকভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে পর্যায়ক্রমে বিবেচনা করা হবে।
তিনি বলেন, আপনারা জানেন বর্তমান সরকার একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্র পেয়েছে। পেয়েছে দুর্বল অর্থনীতি, বিভাজিত প্রশাসন, ভঙ্গুর শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা। সেই অবস্থা থেকে সরকার সফলভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। এমন পরিস্থিতিতেও রাষ্ট্র, রাজনীতি, শাসন, প্রশাসনে ফ্যাসিবাদের সুবিধাভোগীরা কিন্তু বসে নেই। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা লক্ষ্য করেছি, একটি চক্র সুকৌশলে জ্বালানি কিংবা বিদ্যুৎ সেক্টরকে অস্থিতিশীল করার জন্য সক্রিয়। তবে ইতিবাচক উদ্যোগের মাধ্যমে সরকার সকল পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জ্বালানি খাতকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্বনির্ভর করতে বাস্তবমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা পদ্ধতি আরও আধুনিক করতে সরকার প্রথমবারের মতো স্বাস্থ্যখাতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ রেখেছে। পর্যায়ক্রমে এই বরাদ্দ আগামী পাঁচ বছরে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, এর পাশাপাশি যতদ্রুত সম্ভব ই-হেলথ কার্ড চালু করার কাজ শুরু হয়েছে। প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালকে ১০১ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে চিকিৎসকগণ যদি সেবার মানসিকতা নিয়ে নিজেদেরকে নিবেদিত না রাখেন তাহলে শুধুমাত্র অবকাঠামোগত উন্নতি দিয়ে সফলতা আসবে না।
চিকিৎসকদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আপনাদের নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হয়। এরপরও কিছু ক্ষেত্রে অনিচ্ছাকৃত অবহেলা বা দায়িত্ব পালনে শৈথিল্য একদিকে সরকারের সামগ্রিক কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। অপরদিকে চিকিৎসক এবং চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে জনমনে অনাস্থা তৈরি করে।
এক্ষেত্রে জনগণ চিকিৎসকদের কাছ থেকে আরও দায়িত্বশীল ও মানবিক ভূমিকা প্রত্যাশা করে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, আসুন, আমরা সকলে মিলে এমন একটি চিকিৎসাবান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তুলি, যেখানে দেশের প্রতিটি মানুষ মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পাবে এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য তাদেরকে বিদেশমুখী হতে হবে না।
সমাবেশে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ড্যাবের নেতাকর্মী ও চিকিৎসকেরা অংশ নেন। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত, ড্যাব সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ, ড্যাব মহাসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিল ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ।-বাসস

