দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার ডাক জামায়াত আমিরের

স্টাফ রিপোর্টার : আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে জনগণকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, প্রথম ভোট হবে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে এবং দ্বিতীয় ভোট হবে দুর্নীতিমুক্ত, শোষণহীন ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে ইনসাফের প্রতীক দাঁড়িপাল্লায়। দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন গড়ে তুলতে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ মানে আজাদি, আর না মানে গোলামি। ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় জনগণের রায়ই হবে চূড়ান্ত শক্তি।’
তিনি আরও বলেন, ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যজোটের প্রার্থীদের মধ্যে কোনো ব্যাংক ডাকাত, চাঁদাবাজ, ঋণখেলাপি কিংবা নারী নির্যাতনকারী নেই। ‘আমরা নিজেরা দুর্নীতি করব না এবং কোনো দুর্নীতিবাজকে প্রশ্রয়ও দেব না। যোগ্যতা ও সততার ভিত্তিতেই প্রার্থী বাছাই করা হয়েছে,’ বলেন জামায়াত আমির।
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
রাষ্ট্র পরিচালনায় জামায়াতের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াতে ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে দেশের প্রতিটি শিশুর শিক্ষার ব্যয়ভার রাষ্ট্র বহন করবে। প্রাথমিক থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা হবে। তিনি বলেন, শিক্ষাই হবে জাতি গঠনের প্রধান হাতিয়ার।
তরুণদের কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতা বেকার ভাতা চায়নি, তারা চেয়েছে কাজের অধিকার।’ ক্ষমতায় গেলে তরুণদের সঠিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলে সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্য নয়, বরং যোগ্যতা ও দেশপ্রেমকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হবে জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার সবার জন্য সমানভাবে সংরক্ষণ করা হবে।
জামায়াত আমির বলেন, আল্লাহ সমস্ত সৃষ্টির খালিক, আমরা বাকিরা সব মাখলুক। আল্লাহ তায়ালা জানেন তার কোন সৃষ্টির কোথায় কী প্রয়োজন, কোথায় কী দুর্বলতা, কী তার পোটেনশিয়াল রয়েছে—এটা আল্লাহর চাইতে কেউ বেশি বুঝে না। সেই আল্লাহ মানবজাতির অভিভাবক, রব। তিনি যে বিধান দিয়েছেন, এটা দুনিয়ার সর্বোত্তম বিধান। এ বিধান কারো কোনো ক্ষতি করতে পারে না। এ বিধান সমস্ত মানবজাতির সৃষ্টির জন্য।
তিনি বলেন, আমাদের কথা সাফ, আমরা আল্লাহর কাছে জনগণের কাছে ওয়াদাবদ্ধ। জনগণের রায়ের ভোটের ভালোবাসা ও সমর্থনে আল্লাহ যদি দেশ পরিচালনার সুযোগ আমাদের দেন, আমরা ইনশা আল্লাহ কাউকে আর চাঁদাবাজি করতে দেব না। ইনশা আল্লাহ এ দেশে কারও দুর্নীতি করার সুযোগ থাকবে না। এই দেশে রাজার ছেলে রাজা হবে—বংশানুক্রমিক পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতি আর চলবে না। এই দেশে রাজনীতি হবে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে, দেশপ্রেমের প্রমাণের ভিত্তিতে। এই দেশে আর আধিপত্যবাদী রাজনীতি চলবে না। প্রতিবেশীসহ সারা দুনিয়ার সঙ্গে আমাদের চমৎকার সম্পর্ক থাকবে। এই সম্পর্ক হবে সমতা ও মর্যাদার ভিত্তিতে। আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চাই। এই যুব সমাজকে থামানো যায়নি, থামানো যাবে না ইনশাআল্লাহ।
পর্যটন শিল্পের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, অবহেলা ও দুর্নীতির কারণে দেশের পর্যটন খাত আজ সংকটে পড়েছে। জামায়াত ক্ষমতায় গেলে রাজশাহীর প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোকে বিশ্বমানের পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তর করা হবে। এতে জাতীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে এবং হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
আগামী ১২ তারিখের নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে তিনি বলেন, এটি কোনো সাধারণ নির্বাচন নয়; এটি জাতির ভাগ্য পরিবর্তনের নির্বাচন। বহু ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে এই সুযোগ এসেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে শিশু, বৃদ্ধ, নারী সবাই নিরাপদ থাকবে। সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে, অপরাধী যেই হোক, তার শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।’
নারী ও শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কর্মস্থলে নারীদের জন্য ডে-কেয়ার ও বেবি-কেয়ার সেন্টার গড়ে তোলা হবে। শিল্প ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ে রাষ্ট্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তাদের বিরুদ্ধে দাঁড় করাবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
রাজশাহী প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, রাজশাহীর কিছু সমস্যা আছে। মেডিকেল কলেজ আছে বহু পুরোনো। ডেন্টাল কলেজ স্থাপন করা দরকার। ইনশাআল্লাহ আর কটা দিন তো সবর করেন, দাবি করতে হবে না, আমরা খুঁজে খুঁজে বের করব জাতিকে কোথায় কোথায় কী দরকার। সুগার মিল, এটা লোকসানি, শ্রমিকরা কাজ করে, লোকসানি কেন হবে? চুরি-চামারির জন্য লোকসানি। মাওলানা নিজামী বন্ধ মিল-কারখানা একটা একটা করে খুলতে শুরু করেছিলেন, চুরি বন্ধের জন্য এটা হয়েছিল। আমাদের ব্লু ইকোনোমিতে এখনো আমরা ঢুকতে পারিনি। আল্লাহ যদি আমাদের তৌফিক দেন, আমরা কারও চোখ রাঙানির পরোয়া করব না। দেশের সম্পদ দেশের মানুষের জন্য তুলে আনার চেষ্টা করব।
সবশেষ তিনি বলেন, আমরা ১৩ তারিখ থেকে জামায়াতে ইসলামীর সরকার চাই না, দলীয় সরকার চাই না, পরিবার ও গোষ্ঠীতান্ত্রিক সরকার চাই না। আমি চাই বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের বিজয়। সেই বিজয় যদি অর্জিত হয়, সেই বিজয় সকলের বিজয় হবে। আল্লাহর মেহেরবাণিতে আমরা সেজদায় পড়ে যাব। আমরা ওই দিনটার অপেক্ষা করছি। কোনো কালো চিল এসে যেন স্বপ্ন এলোমেলো করতে না পারে।
নেতাকর্মীদের উদ্দেশে জামায়াত আমির বলেন, সিনা মজবুত করে শক্ত করে দাঁড়িয়ে যেতে হবে। আমরা পারব ইনশাআল্লাহ। নাহলে বাংলাদেশ হেরে যাবে। সারা বাংলাদেশে জোয়ার শুরু হয়েছে। আল্লাহ যেন এ জোয়ার সংসদে পৌঁছায়।
মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি এমাজ উদ্দিন মণ্ডল এবং সাংগঠনিক সম্পাদক জসিম উদ্দিন সরকারের সঞ্চালনায় জনসভায় বক্তব্য রাখেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ও রাজশাহী-১ (তানোর-গোদাগাড়ী) আসনের প্রার্থী অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা)-এর সহসভাপতি রাশেদ প্রধান, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর দক্ষিণ অঞ্চলের যুগ্ম মুখ্য সংগঠক ডা. মাহমুদা আলম মিতু, রাজশাহী (সদর) আসনের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী ডা. মো. জাহাঙ্গীর, রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ, রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী ডা. আব্দুল বারী সরদার, রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী মুনজুর রহমান এবং রাজশাহী-৬ (বাঘা-চারঘাট) আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী অধ্যক্ষ নাজমুল হক।
এর আগে, বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজশাহীর গোদাগাড়ীর মহিষালবাড়ি মহিলা ডিগ্রি কলেজ মাঠে আরেক জনসভায় বক্তব্য দেন তিনি। জনসভায় ডা. শফিকুর রহমান রাজশাহী-১ থেকে রাজশাহী-৬ আসনের জামায়াত প্রার্থীদের হাতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক তুলে দেন। মাদ্রাসা মাঠের সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন রাজশাহী মহানগর জামায়াতের আমির ডা. কেরামত আলী। গোদাগাড়ীর জনসভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা জামায়াতের আমির আব্দুল খালেক।
সমাবেশ ঘিরে মাদ্রাসা মাঠে নারী ও পুরুষদের জন্য আলাদা বসার ব্যবস্থা করা হয়। মিডিয়াকর্মী ও জুলাই আন্দোলনের আহতদের জন্যও পৃথক স্থান নির্ধারণ করা হয়।
মহানগর জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক জসিম উদ্দীন সরকার বলেন, রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে নারী-পুরুষের অংশগ্রহণে এটি ছিল জামায়াতের অন্যতম বৃহৎ ও সুশৃঙ্খল সমাবেশ।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *