
স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহী অঞ্চলে অবাধে কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি বা টপসয়েল কেটে ইটভাটায় ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে জমির উর্বরতা নষ্ট হয়ে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, একবার টপসয়েল তুলে নেওয়া হলে সেই জমির স্বাভাবিক উর্বরতা ফিরে পেতে অন্তত এক দশক সময় লাগে।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাবশালী একটি চক্র সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কৃষকদের মাটি বিক্রি করতে বাধ্য করছে। প্রথমে তারা মাঠের মাঝখানের জমির মাটি কেটে নেয়। এতে আশপাশের জমি নিচু হয়ে পড়ে। ফলে সেচ ও চাষাবাদে সমস্যা দেখা দেয় এবং একপর্যায়ে পাশের জমির মালিকরাও বাধ্য হয়ে মাটি বিক্রি করতে রাজি হন।
পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, তানোর, পবা, মোহনপুর, গোদাগাড়ী, দুর্গাপুর, পুঠিয়া, চারঘাট, বাঘা, বাগমারা ও তাহেরপুর উপজেলায় অন্তত ২০০টি ইটভাটায় ফসলি জমির টপসয়েল ব্যবহার করা হচ্ছে। গত কয়েক সপ্তাহে বাগমারা উপজেলার কয়েকটি ইটভাটায় অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হয়েছে এবং কয়েকটি ভাটা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে বারবার অভিযান চালিয়েও এই অবৈধ কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না।
গোদাগাড়ী উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নের একটি ইটভাটার টেকনিশিয়ান জানান, মাটি ছাড়া ইট তৈরি সম্ভব নয়। এজন্য অনেক সময় রাতের আঁধারে উঁচু ফসলি জমি থেকে মাটি কেটে ভাটায় আনা হয়। পবার পারিলা ইউনিয়নের একটি ইটভাটার টেকনিশিয়ান কামাল উদ্দিন বলেন, একটি ইট তৈরি করতে প্রায় পাঁচ কেজি মাটি লাগে। বছরে একটি ভাটায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ইট উৎপাদন করা হয়, যার জন্য বিপুল পরিমাণ মাটি প্রয়োজন। ইট তৈরির ক্ষেত্রে টপসয়েলই সবচেয়ে উপযোগী।
ইটভাটা মালিকদের দাবি, কৃষকরা স্বেচ্ছায় মাটি বিক্রি করেন। রামচন্দ্রপুর এলাকার ইটভাটা মালিক বাবু হোসেন বলেন, ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকরাই মাটি বিক্রিতে আগ্রহ দেখান। আমরা মাটি না কিনলে ইটভাটা বন্ধ হয়ে যাবে, এতে উন্নয়ন কাজ ব্যাহত হবে।
তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন বলে জানান কৃষকরা। গোদাগাড়ী উপজেলার মাটিকাটা ইউনিয়নের কৃষক আলতাব উদ্দিন বলেন, একসঙ্গে কয়েক বিঘা জমির মাটি কেটে নেওয়ায় পাশের জমি নিচু হয়ে যায়। তখন সেচ ও চাষাবাদে সমস্যা দেখা দেয় এবং বাধ্য হয়েই মাটি বিক্রি করতে হয়। বাগমারা উপজেলার কৃষক আবুল সরকার জানান, এক বিঘা জমির টপসয়েল ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। শুরুতে লাভজনক মনে হলেও পরে কয়েক বছর ভালো ফলন পাওয়া যায় না।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে কৃষিজমির অপূরণীয় ক্ষতি ও পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে। রাজশাহী জেলা মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. নুরুল ইসলাম বলেন, টপসয়েলে জৈব উপাদান ও অণুজীব সবচেয়ে বেশি থাকে। এই স্তরটি তুলে নেওয়া হলে জমির উর্বরতা ফিরতে দশ বছরেরও বেশি সময় লাগে।
রাজশাহী অঞ্চলের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, নির্বিচারে মাটি কাটার ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। রাজশাহী পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক কবির হোসেন জানান, বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে এবং বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে জরিমানা ও ভাটা গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে রাজশাহী জেলা প্রশাসক আফিয়া আক্তার বলেন, অভিযোগের ভিত্তিতে সরেজমিনে গিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ড. আ ন ম বজলুর রশীদ জানান, কৃষিজমি থেকে টপসয়েল কাটা বন্ধে উপজেলা প্রশাসনকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

