কারিগরি শিক্ষা : চাকুরী ও উদ্যোক্তা সৃষ্টির দ্বার উন্মোচন হবে

ইউসুফ চৌধুরী : প্রযুক্তির ছোয়ায় পৃথিবী এখন হাতের মুঠোয়। প্রযুক্তির অন্যতম সফল হাতিয়ার হলো কম্পিউটার। মানবসম্পদ উন্নয়নে যুগের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে কম্পিউটার ও প্রযুক্তিভিত্তিক কারিগরি শিক্ষার প্রয়োজন। কম্পিউটার তথা কারিগরি শিক্ষা তরুণ সমাজকে বিভিন্ন প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করে। স্বল্প সময়ে দেশের বিপুল সংখ্যক জনসংখ্যাকে দক্ষ জনসম্পদে রূপান্তরিত করা সম্ভব। এই দ্ক্ষ হাতগুলো একযোগে কাজ করলে কর্মসংস্থানের সংকট দূর ও হতাশা মোচনে যথেষ্ট সহায়ক হবে। ব্যক্তি তথা দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আধুনিক বিশ্বকে কম্পিউটার ছাড়া কল্পনা করা যায় না। প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে দৈনন্দিন কাজকর্ম থেকে শুরু করে পরিচালিত হচ্ছে অফিস-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসা, কল-কারখানা, যন্ত্রপাতি, জাহাজ, সাবমেরিন, বিমান, স্যাটেলাইট, ক্ষেপণাস্ত্র (মিসাইল), পারমানবিক প্রযুক্তি সহ নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে সারাবিশ্বের সকল কার্যক্রম। প্রযুক্তির তৈরী গুগল, ইউটিউব, এআই, চ্যাটজিপিটি সহ বিভিন্ন সফটওয়্যার ব্যবহারের মাধ্যমে মুহুর্তেই পাওয়া যাচ্ছে প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। মানুষের বুদ্ধিমত্তা ও চিন্তাশক্তিকে কৃত্রিম উপায়ে প্রযুক্তি নির্ভর করে যন্ত্রের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) এর মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। মেধার বিকাশ ঘটিয়ে তৈরী হচ্ছে নিত্যনতুন প্রযুক্তি এবং এর ব্যবহারের ফলে নিয়ন্ত্রিত ও পরিবর্তন হচ্ছে সবকিছু। পাল্লা দিয়ে ছুটছে কে কাকে ছাড়িয়ে উপরে উঠবে সেই প্রতিযোগিতায়। এসব কিছু সম্ভব হয়েছে কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষতা অর্জনের ফলে।
শিক্ষিত জাতিরাই পারে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে দেশ তথা সারা বিশ্বের পরিবর্তন করতে। এজন্য সাধারণ শিক্ষার সাথে সমানতালে প্রয়োজন কারিগরি শিক্ষা যা জনগণকে জনশক্তিতে রূপান্তরের অন্যতম মাধ্যম। কারণ, কারিগরি শিক্ষার মূল লক্ষ্য হচ্ছে অদক্ষ জনগোষ্ঠীকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তিতে রপান্তর করে দেশের সার্বিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করা। এই শিক্ষা সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীকে হাতে-কলমে প্রযুক্তি নির্ভর প্রশিক্ষণদানসহ আত্ম-কর্মসংস্থানমূলক জ্ঞানার্জনে সাহায্য করে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার আরাফাত আমান আজিজ বলেন, “শিক্ষা মানুষকে সমৃদ্ধ করে। শিক্ষার সঙ্গে রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও অগ্রগতি নির্ভরশীল। উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণে প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা। কর্মক্ষম মানবসম্পদে পরিণত করতে প্রয়োজন আনুষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা তথা কর্মমুখী শিক্ষা। কারিগরি শিক্ষা ছাড়া অধিক জনশক্তিকে জনসম্পদে রূপান্তর করা অসম্ভব। কারিগরি শিক্ষায় যে বেশি দক্ষ সে তত বেশি উন্নত। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে মানবসম্পদ উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই।”
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ও আইডিইবি, রাজশাহীর সাবেক অর্থ-সম্পাদক প্রকৌশলী মো. আবু বাশির বলেন, “কারিগরি শিক্ষাকে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে পৌছানোর লক্ষ্যে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। বেকার, অসহায় ও দরিদ্র মেধাবীদের কারিগরি শিক্ষা গ্রহনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।”
ইউসেপ রাজশাহী অঞ্চলের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক মো. শাহিনুল ইসলাম বলেন, “ইউসেপ বাংলাদেশ সমাজের শিক্ষাবঞ্চিত শিশু ও সুবিধাবঞ্চিত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কারিগরি শিক্ষায় দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে স্বাবলম্বী করতে কাজ করছেন। কারিগরি উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ড্রাইভিং, ইলেকট্রিক্যাল, ইলেকট্রনিক্স, টেইলারিং, ওয়েল্ডিং, মোবাইল ফোন সার্ভিসিং, কম্পিউটার সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যক্তিকে দক্ষ করে তোলে। ব্যক্তি দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে নিজের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে সেইসাথে অন্যদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে সহযোগিতা করে।”
উপজেলা আইসিটি অফিসার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, “আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির গুরুত্ব বিশাল এবং বহুমাত্রিক। বর্তমান বিশ্বে ব্যক্তিগত, সামাজিক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা, প্রশাসনসহ প্রায় সকল ক্ষেত্রেই তথ্য প্রযুক্তি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। তথ্য প্রযুক্তি খাতে দক্ষ হয়ে ঘরে বসে বৈশ্বিক বাজারে কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফ্রিল্যান্সিং, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ডিজিটাল মার্কেটিং ইত্যাদি নতুন কর্মসংস্থানের পথ খুলে দিয়েছে। তথ্য বিশ্লেষণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), মেশিন লার্নিং ইত্যাদি প্রযুক্তির মাধ্যমে গবেষণার মান ও গতির উন্নতি ঘটেছে। আধুনিক তথ্য প্রযুক্তি একটি উন্নত, দক্ষ ও সংযুক্ত বিশ্বের দ্বার উন্মোচন করেছে।
কম্পিউটার তথা কারিগরি শিক্ষা কেবল প্রযুক্তিগত দক্ষতাই নয় বরং আপনার ব্যক্তিগত ও পেশাগত উন্নতির দ্বারও উন্মোচন করে। কর্মক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত জ্ঞানের প্রসারে অর্জিত দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে নতুন উদ্ভাবনী পণ্য বা সেবা তৈরি করে। আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উদ্যোক্তা তৈরী, বেকারত্ব দূর এবং দারিদ্র বিমোচন হয়। জীবনযাত্রার মান উন্নত এবং আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়। বেকারত্বের অভিশাপ ঘোচাতে জনগণকে যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করতে কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণের বিকল্প নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *