রাজশাহী নগর বিএনপি’র নেতৃত্ব কেন্দ্রের দিকে তাকিয়ে

স্টাফ রিপোর্টার : রাজশাহী মহানগর বিএনপির দ্বি-বার্ষিক সম্মেলনকে ঘিরে আমেজ আর উৎসাহ বাড়ানোর লক্ষ্যে সম্মেলন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়েও শহরজুড়ে প্রচার প্রচারণা চালানো হয়েছে চাররঙা পোস্টার-ব্যানার আর ফেস্টুন দিয়ে। হয়েছে ঘণঘণ দলীয় সভা-সমাবেশ। নির্দিষ্ট সময়ে সফলতার সাথে সম্পন্ন হয়েছে দলীয় আয়োজন। সম্মেলনের ১৩ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো পর্যন্ত সভাপতি-সম্পাদকসহ পূর্ণাঙ্গ কমিটির নাম ঘোষণা হয়নি। নতুন কমিটির নাম ঘোষণা না হলেও সম্মেলনের পরেরদিন ১০ আগস্ট নিয়মমাফিক হয়েছে পূর্ববর্তী আহ্বায়ক কমিটির বিলুপ্তির ঘোষণা। নতুন কমিটির নাম কেন্দ্র থেকে প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত মহানগর বিএনপির দায়িত্ব দেয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির রাজশাহী বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত দুই সহসাংগঠনিক সম্পাদক আমিরুল ইসলাম (আলীম) এবং এ এইচ এম ওবায়দুর রহমান (চন্দন) কে।
একদিকে থানা তো অন্যদিকে মহানগর; দুটো নিয়েই রাজশাহীর রাজনীতির পরিমন্ডল অপেক্ষার প্রহরে নিমজ্জিত রয়েছে। কয়েকদিন ধরে নগরীর চায়ের আড্ডায় শোনা যাচ্ছে ২৩-২৪ তারিখের কথা। ওয়ার্ড ও পাড়া মহল্লাভিত্তিক নেতাকর্মীর মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে ২৩-২৪ আগস্টের মধ্যেই আসতে পারে কাঙ্খিত সেই ঘোষণা। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করে তেমন কিছু বলতে পারছে না। দলীয় সূত্র বলছে, মহানগর বিএনপির সভাপতি-সম্পাদক সহ শীর্ষ পদগুলোর জন্য স্বপ্ন দেখছেন প্রায় ডজনখানেক সাবেক ও বর্তমান নেতা। মূল দল ছাড়াও অপেক্ষার তালিকায় নিজেদের নাম লিখিয়েছেন যুবদলের একাধিক নেতাও। অন্যদিকে, ঝুলে থাকা থানা কমিটির সভাপতি আর সম্পাদকের পদ নিয়েও গুণতে হচ্ছে অপেক্ষার প্রহর। মহানগরের একাধিক সিনিয়র নেতা চাইছেন নিজেদের বেল্টের নেতাকর্মীদের দিয়ে সাজাতে থানা কমিটি।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর এরশাদ আলী ঈশাকে আহ্বায়ক ও মামুন অর রশিদ মামুনকে সদস্যসচিব করে মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এর প্রায় সাড়ে তিন মাস পর আহ্বায়ক কমিটির পরিধি বাড়িয়ে ৬১ সদস্যের করা হয়। তার পর থেকে প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে এই আহ্বায়ক কমিটিতেই চলেছে রাজশাহী মহানগর বিএনপি। এ কমিটিতে যোগ্য নেতৃত্ব আসেনি, এমন অভিযোগ তুলে রাজশাহী মহানগর কেন্দ্রিক দলটির শীর্ষ নেতাদের একাংশ তাঁদের সঙ্গে কোনো সভা-সমাবেশে অংশ নিতেন না। বিরোধ ছিল অনেকটাই প্রকাশ্যে। এই বিরোধের জের ধরে দলীয় কার্যালয়ে তালা দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। আহ্বায়ক কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুন কমিটি করার দাবিতে নানা কর্মসূচি পালন করে আসছিলেন দলের একাংশের নেতা-কর্মীরা। সেই দাবির একাংশ পূর্ণ হয়েছে ১০ আগস্টের দ্বি-বার্ষিক সম্মেলন আয়োজনের মধ্য দিয়ে। এখন শুধু কাঙ্খিত ঘোষণার প্রহর গুণছেন দলের নেতাকর্মীরা। প্রহর শেষ হবে কবে, কবে আসবে মহানগর বিএনপির পুর্ণাঙ্গ কমিটির ঘোষণা; কারা পাবেন কমিটির শীর্ষ পদগুলোর দায়িত্ব; কাদের হাতে যাবে নগর বিএনপির দায়িত্ব; এমন প্রশ্ন আর শঙ্কা এখন তৃণমূল থেকে মহানগর বিএনপির সর্বোচ্চ পর্যায়ে।
সর্বশেষ ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত সম্মেলনের পর ২০১৬ সালে রাজশাহী জেলা ও মহানগরের নতুন কমিটি ঘোষণার মধ্যদিয়ে উভয় কমিটির র্শীষ চারটি পদের তিনটিতেই নতুনদের নেতৃত্বে নিয়ে আসা হয়েছিল বলে জানায় দলীয় সূত্র। ২০১৬ সালের ২৬ ডিসেম্বর তৎকালিন বিএনপি’র কেন্দ্রীয় সহ-দফতর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে রাজশাহী মহানগর বিএনপি’র সভাপতি পদ থেকে মিজানুর রহমান মিনুকে বাদ দিয়ে মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকে করা হয়েছিল মহানগর বিএনপি’র সভাপতি। আর শফিকুল হক মিলনকে সাধারণ সম্পাদক করে রাজশাহী মহানগর বিএনপি’র ৩৭ সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল সেসময়। এর আগে, ২০০৯ সালের সম্মেলনে মিজানুর রহমান মিনুকে রাজশাহী মহানগর বিএনপি’র সভাপতি ও অ্যাডভোকেট শফিকুল হক মিলনকে সাধারণ সম্পাদক করে রাজশাহী মহানগর কমিটি গঠিত হয়েছিল। সেই পূর্ববর্তী সময়গুলোর কমিটি সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মী আর সদ্য বিলুপ্ত হওয়া মহানগর আহ্বায়ক কমিটির অনুসারীদের মধ্যে আসন্ন নতুন কমিটি ঘিরে চলছে রাজনৈতিক উত্তেজনা।
বেশকয়েক বছর ধরেই রাজশাহী মহানগর বিএনপি দুইভাগে বিভক্ত হয়ে চালিয়েছে দলীয় কর্মতৎপরতা। তবে, গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী সময় থেকে এখন অবদি মহানগর বিএনপির স্থায়ী কমিটিকে ঘিরে দুইপক্ষের মধ্যে বিভেদ সুপ্ত থেকে রূপ নিয়েছে প্রকাশ্যে। এখন সেটি আর কানাঘুষা কিংবা সিক্রেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিগত কয়েক বছর ধরে এটি রূপ নিয়েছে ওপেন সিক্রেটে। তবে, সর্বশেষ দ্বি-বার্ষিক সম্মেলনকে ঘিরে যদিওবা সেই দ্বন্দ্ব আর বিভেদের ঘৌড়দৌড় কিছুটা গতি কমিয়েছিল; কিন্তু মহানগর বিএনপির কমিটির মধ্যে কোনপক্ষের পাল্লা বেশি ভারি হবে; আর কোনপক্ষের পাল্লা হবে হালকা সেটি নিয়ে নতুন করে শুরু হয়েছে দৌড়ঝাপ। চলছে উভয়পক্ষের লবিং- গ্রুপিং আর নানামুখী হিসেব-নিকেশের পাল্লাপাল্লি। একপক্ষ চাচ্ছে কমিটিতে থাক নিজেদের পছন্দের নেতাকর্মীরা। আর অন্যপক্ষের দাবি, তারা বঞ্চিত হচ্ছেন মহানগর বিএনপির রাজনীতি থেকে।
গত ১০ আগস্টের দ্বি-বার্ষিক সম্মেলন পরবর্তী সময়ে ‘বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ও রাজশাহী বিভাগের সমন্বয়কারী বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালামের সাথে ঢাকা গিয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন উভয়পক্ষের নেতাকর্মীদের একাংশ। কমিটি গঠন নিয়ে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মন্তব্য, আগামী নির্বাচনে ভালো কিছু পেতে হলে দুটি নয়; একটি বৃত্তেই আসা উচিৎ সবাইকে। দুইভাগে বিভক্ত নগর বিএনপিকে একটি বৃত্তে আনতে হলে বহু প্রতিক্ষিত মহানগর কমিটিতে সকলপক্ষের যোগ্য ব্যক্তিদের স্থান করে দেয়া উচিত। নতুবা দ্বন্দ্ব আর বিভেদ সুপ্তাকারে থেকেই যাবে দলের মধ্যে। যেটির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পড়তে পারে আগামী নির্বাচনে বলে মন্তব্য স্থানীয় নেতাকর্মীদের।
জানতে চাইলে সদ্য বিলুপ্ত হওয়া মহানগর আহ্বায়ক কমিটির সাবেক আহ্বায়ক এরশাদ আলী ঈশা বলেন, বিষয়টি নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছেনা। এটা কেন্দ্র নেতাদের বিষয়। সদস্য সচিব (সাবেক) মামুন-অর-রশিদ বলেন, বিষয়টি কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত। আল্লাহতালাহ চাইলে আগামী সপ্তাহের মধ্যে ঘোষণা আসতে পারে। থানা কমিটির বিষয়ে তিনি বলেন, মহানগর কমিটি ঘোষণার আগে দুই থানা কমিটির ঘোষণা আসার সম্ভাবনা আছে। রাজশাহী মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, ঘোষণার বিষয়টি কেন্দ্র সংশ্লিষ্ট। মহানগর কমিটির ঘোষণা কবে আসবে সেটা কেন্দ্রের দায়িত্বরত নেতারাই ভাল জানেন।
এর আগে গত ১৯ ও ২০ জুন যথাক্রমে রাজশাহী মহানগরীর চন্দ্রিমা থানা ও শাহমখদুম থানা বিএনপির কর্মী সম্মেল অনুষ্ঠিত হয়। থানা ও ওয়ার্ডভিত্তিক বিএনপির সাংগঠনিক শক্তিকে স্থায়ীরূপ দিতে আহ্বায়ক কমিটির পরিবর্তে স্থায়ী কার্যনির্বাহী কমিটি গঠণের লক্ষ্যে এই কর্মী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। দুই মাস অতিক্রম হলেও সেই কমিটির সভাপতি-সম্পাদকের নাম ঘোষণা হয়নি এখনো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *