কুইজ, প্রশ্ন আর বাস্তব গল্পে শিক্ষার্থীরা শিখলো তথ্য অধিকারের গুরুত্ব

স্টাফ রিপোর্টার : “তথ্য চাইলে কি সত্যিই পাওয়া যায়?”—এক শিক্ষার্থীর এমন সরল প্রশ্নে মুহূর্তেই নীরব হয়ে যায় মিলনায়তন। মঞ্চ থেকে পাল্টা উত্তর আসে, “তথ্য পাওয়া আপনার অধিকার।” সঙ্গে সঙ্গে করতালিতে ভরে ওঠে পুরো হলরুম। কুইজ, প্রশ্ন-উত্তর আর বাস্তব জীবনের গল্পে এমনই প্রাণবন্ত ও নাটকীয় পরিবেশে নওহাটা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সামনে অনুষ্ঠিত হয়েছে তথ্য অধিকার বিষয়ক ওরিয়েন্টেশন সভা।

মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) সকালে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত এ সভায় বক্তারা বলেন, তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত করা ছাড়া জবাবদিহিমূলক ও স্বচ্ছ রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। মানুষের জানার আগ্রহ চিরন্তন। নাগরিক হিসেবে তথ্য চাওয়া ও পাওয়ার অধিকারই হলো তথ্য অধিকার। তথ্য মানেই শক্তি, যা সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখে। জাতিসংঘ ও বাংলাদেশের সংবিধানে তথ্য অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯(১) অনুচ্ছেদেও এই অধিকারের কথা উল্লেখ রয়েছে।

নাগরিকদের তথ্য জানার অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে তথ্য অধিকার আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এ সভার আয়োজন করে দ্য কার্টার সেন্টারের বাংলাদেশ কান্ট্রি অফিস। অনুষ্ঠানটি দুর্নীতি দমন কমিশনের সততা সংঘের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় তথ্য অধিকার আইনের সফল প্রয়োগের কয়েকটি বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরা হয়। কোথাও উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় সংক্রান্ত তথ্য জানার মাধ্যমে অনিয়ম রোধ, আবার কোথাও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে প্রকৃত উপকারভোগী নিশ্চিত করার অভিজ্ঞতা শোনানো হয়। বাস্তব এসব গল্প শিক্ষার্থীদের কৌতূহলী করে তোলে এবং তথ্য অধিকার যে কাগুজে বিষয় নয়, বরং জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত—তা স্পষ্ট করে।

ওরিয়েন্টেশনে জানানো হয়, তথ্য অধিকার (আরটিআই) নাগরিকদের একটি মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার, যার মাধ্যমে সরকারি ও নির্দিষ্ট বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে থাকা তথ্য জানা যায়। আলোচনায় তথ্য অধিকার আইন ২০০৯–এর পটভূমি, উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি তথ্যের সংজ্ঞা, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ ও তাঁদের দায়িত্ব, তথ্য প্রদানে প্রতিষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা, আবেদন দাখিলের নিয়ম, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উত্তর প্রদানের প্রক্রিয়া এবং আবেদন ফি সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের স্পষ্ট ধারণা দেওয়া হয়।

‘আইন জানো, অধিকার জানো’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত কুইজ প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ সভাটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। সঠিক উত্তরে করতালি আর ভুল উত্তরে হাসিতে মিলনায়তন পরিণত হয় এক উন্মুক্ত শিক্ষাঙ্গনে। আয়োজকদের মতে, এমন অংশগ্রহণমূলক আয়োজন তরুণদের মধ্যে আইন ও নাগরিক অধিকার বিষয়ে আগ্রহ তৈরি করতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

সভায় শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকেও নিজেদের অনুভূতি তুলে ধরা হয়। নওহাটা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী রিমতি বলেন,“আজকের আয়োজনের আগে তথ্য অধিকার বিষয়টি শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল। বাস্তব উদাহরণ ও কুইজের মাধ্যমে আমরা বুঝতে পেরেছি, কীভাবে তথ্য জানার মাধ্যমে অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো যায়। এখন মনে হচ্ছে, আমরাও চাইলে প্রশ্ন করতে পারি।”

অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইফাত বলেন, “তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে আগে তেমন ধারণা ছিল না। আজ জানতে পারলাম, সাধারণ নাগরিক হিসেবেও আমরা সরকারি দপ্তর থেকে তথ্য চাইতে পারি। এই জ্ঞান আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে এবং ভবিষ্যতে সচেতন নাগরিক হতে অনুপ্রাণিত করেছে।”

সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন দুর্নীতি দমন কমিশনের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. ফজলুল বারী। তিনি বলেন, তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ কার্যকরভাবে প্রয়োগ হলে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা বাড়ে এবং দুর্নীতির সুযোগ কমে যায়। তথ্য অধিকার কেবল একটি আইন নয়, এটি নাগরিক ক্ষমতায়নের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। শিক্ষার্থী ও তরুণদের মধ্যে এই বিষয়ে সচেতনতা তৈরি হলে ভবিষ্যতে একটি জবাবদিহিমূলক ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা সহজ হবে।

স্বাগত বক্তব্যে দ্য কার্টার সেন্টারের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ শাম্মী লায়লা ইসলাম বলেন, সঠিক তথ্যই শক্তি। নারীদের তথ্য প্রাপ্তির অধিকারসহ তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে এই আইন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অধিকার সম্পর্কে জানলেই তা সঠিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা দুর্নীতি দমন কমিশনের সহকারী পরিচালক তানভীর আহমেদ, নওহাটা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ওমর আলী এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি পবা উপজেলার সভাপতি মো. আখতার ফারুক। সভা শেষে শিক্ষার্থীদের চোখে-মুখে যে সচেতনতা ও আত্মবিশ্বাসের ছাপ দেখা যায়, তা ভবিষ্যতের দায়িত্বশীল নাগরিক সমাজ গঠনেরই আশাব্যঞ্জক ইঙ্গিত দেয়।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *