
অনলাইন ডেস্ক : নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের পর কাদার মধ্যে নেমে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। নিখোঁজ ১ হাজার ৪০০-এর বেশি মানুষের সন্ধান চলছে।
এ দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৯২ জনে দাঁড়িয়েছে। পুরোপুরি ভেসে গেছে বেশ কয়েকটি গ্রাম।
খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।
বিশেষজ্ঞরা আরও বন্যার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। ভয়াবহ এই দুর্যোগের ঝুঁকি কাটেনি। হিমশীতল পানি ও কাদার স্রোত সুনামির মতো ধেয়ে এসে শহর ও জনপদ তছনছ করে দিয়েছে। কাদার তোড়ে ঘরবাড়ি ডুবে গেছে, সেতু ও বাঁধ ভেঙে পড়েছে এবং খেলনার মতো ভেসে গেছে যানবাহন।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকেই বিদেশি পর্যটক। তাদের মধ্যে হিমালয় অধ্যুষিত নেপালে ভ্রমণে যাওয়া ট্রেকাররাও রয়েছেন। এছাড়া তিব্বতের পবিত্র তুষারঢাকা কৈলাস পর্বতে তীর্থযাত্রায় যাওয়া বহু হিন্দু তীর্থযাত্রীও নিখোঁজ রয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, একটি হিমবাহ ধসে পড়ার কারণে এই দুর্যোগের সৃষ্টি হয়। এতে বরফশীতল পানি, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল স্রোত নিচের দিকে ধেয়ে আসে।
বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহ দ্রুত গলে যাচ্ছে। এতে হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের বন্যা এবং হিমবাহ ধসে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
উদ্ধারকারী দলগুলো দুর্গত এলাকায় জীবিতদের উদ্ধারে দ্রুত কাজ করছে। অন্যদিকে নেপালের সেনারা প্রশিক্ষিত কুকুর দিয়ে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া মরদেহের সন্ধান চালাচ্ছেন।
নেপালের সীমান্তবর্তী শহর তিমুরেতে পাহাড়ের ওপর থেকে উদ্ধার হওয়া ৩৫ বছর বয়সী নেপালি কাস্টমস কর্মকর্তা ওমকার যোশি বলেন, ‘এটা যেন বিশাল এক কবরস্থান। এতে পড়ে আছে শুধু বালি আর নুড়িপাথর, মানুষের রক্তে সেগুলো লাল হয়ে গেছে।’
নেপাল পুলিশ জানিয়েছে, তারা এ পর্যন্ত ৩৮৯টি মরদেহ উদ্ধার করেছে।
দেশটিতে আরও ৯১০ জনের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। তাদের মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশি পর্যটক। এর বাইরে নেপালে থাকা ১০০ জন চীনা নাগরিকেরও কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে বেইজিং। তারা ওই ৯১০ জনের হিসাবের মধ্যে নেই।
নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ভারতীয় নাগরিকের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তাদের ৯০ জন নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, তিব্বতের গিরং বন্দরে এই ‘ভূমিধসজনিত দুর্যোগে’ তিনজন নিহত হয়েছেন। সেখানে আরও ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি।
চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং বৃহস্পতিবার ওই এলাকা পরিদর্শন করেছেন এবং উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম তদারক করেছেন বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।
‘অভ্যন্তরীণ সুনামি’
দুর্যোগের কয়েক ঘণ্টা পরই দেশবাসীকে ‘ঐক্যবদ্ধভাবে পাশে দাঁড়ানোর’ আহ্বান জানান নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। বৃহস্পতিবার তিনি বন্যা ও ভূমিধসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি এলাকা পরিদর্শন করেন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, শাহ স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর জন্য ‘তাৎক্ষণিক সহায়তা নিশ্চিত করতে’ এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া সড়কগুলো খুলে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড জানিয়েছে, নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা ও দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিকও রয়েছেন।
পরিবেশ-ইতিহাসবিদ ও অস্ট্রেলিয়ার লা ট্রোব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রুথ গ্যাম্বল বলেন, আকস্মিকভাবে নেমে আসা কাদা ও ধ্বংসাবশেষের স্রোতটি ‘অভ্যন্তরীণ সুনামি’র মতো ছিল। এটি নেপালের ভেতরে প্রায় ১৭০ কিলোমিটার দক্ষিণ দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
ভারতে নির্বাসিত জীবনযাপনকারী বৌদ্ধ ধর্মীয় নেতা দালাই লামা বলেন, প্রাণ হারানো সবার জন্য তিনি ‘প্রার্থনা করছেন।
চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, তিব্বতে চীনা সরকারি কর্মকর্তারা উদ্ধারকাজে প্রায় ৮০০ জরুরি উদ্ধারকর্মী, প্রশিক্ষিত কুকুর ও স্পিডবোট মোতায়েন করেছেন।
দুর্যোগের ভয়াবহতা সম্পর্কে খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই বিভিন্ন পক্ষ থেকে সহায়তা ও সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি আসতে শুরু করে।
হিমবাহ ধস
ইউএসজিএস জানিয়েছে, একটি হিমবাহ ধসে পড়ার ফলে ভূকম্পনজনিত তৎপরতা তৈরি হয় এবং এর ফলে নেপাল ও তিব্বতের নিম্নাঞ্চলে ‘ভয়াবহ’ প্রভাব পড়ে।
সংস্থাটি জানায়, প্রথমে ঘটনাটিকে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছিল। তবে ভূ-কম্পন সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণের পর দেখা যায়, এটি আসলে ‘হিমবাহ ধস এবং ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ’।
আরও বন্যার আশঙ্কা এখনো রয়েছে। কারণ বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ জমে উপত্যকার কিছু অংশ আটকে যাওয়ায় সেখানে পানি আটকে আছে।
কাঠমান্ডুভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের জলবায়ু ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিভাগের প্রধান কিয়াংগং ঝাং বলেন, ‘নেপাল-চীন সীমান্তের নদীর উজানে এখনো একটি বড় ধরনের বাধা রয়েছে। কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে, এর ফলে দ্বিতীয় দফায় বন্যা দেখা দিতে পারে।’
নেপালের বন্যা পূর্বাভাস বিভাগ বৃহস্পতিবার একটি ‘বিশেষ সতর্কবার্তা’ জারি করেছে। এতে ভূমিধসে তৈরি ধ্বংসাবশেষের কারণে একটি হ্রদের মতো জলাধার তৈরি হওয়ার কথা জানিয়ে সবাইকে অত্যন্ত সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ভারতীয় আধ্যাত্মিক নেতা সদগুরু বৃহস্পতিবার জানান, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বহু হিন্দু তীর্থযাত্রীও সীমান্তে নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন।
চীন সীমান্তের অংশে অবস্থিত পবিত্র কৈলাস পর্বতে তীর্থযাত্রা শেষে ফেরার পথে একটি অভিবাসনকেন্দ্রে বন্যার কবলে পড়েন তারা।
‘পুরো দলটিই ওই ভবনের ভেতরে ছিল’, তিব্বত থেকে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় নিজের লাখো অনুসারীকে এ কথা জানান সদগুরু। কথা বলার সময় তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। এ সময় ভিডিওর পেছনে অন্য তীর্থযাত্রীদেরও কান্নার শব্দ শোনা যায়।
সদগুরু বলেন, ‘এটি একটি ভয়াবহ এবং নজিরবিহীন ঘটনা’।

