অন্যের আনন্দকে নিজের খুশি মনে করতে হয় রাসেলদের

সবুজ সরকার, নিয়ামতপুর : পকেটে থাকা ফোনে বারবার কল আসলেও সেটা রিসিভ করতে পারছিলেন না রাসেল তালুকদার। ফোন রিসিভ করবেন কিভাবে? দুই হাতো তো অক্টোপ্যাডের লাঠি। বাজানো বন্ধ করলেই লোকজনের আনন্দে ছেদ পড়ে যাবে। তাই বাজানোটা চালু রাখতেই হলো। বাজানো শেষ হলে ফোন রিসিভ করে জানতে পারলেন তাঁর ছেলে সন্তান পৃথিবীতে এসেছে। খবর শুনে যারপরনাই খুশি রাসেল। তবে ছুটে যেতে পারেননি ছেলের কাছে। মুঠোফোনে ছেলের ছবি দেখেই খুশি থাকতে হয়েছে। নিজের খুশির চাইতে অন্যকে খুশি করার কর্মটাই শিখেছেন তিনি। তাই অন্যের আনন্দের কাছে নিজের আনন্দটা ম্লান হয়ে গেছে।

রাসেল তালুকদারের বাড়ি সিরাজগঞ্জ জেলার কামারখন্দ উপজেলায়। গত বুধবার নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার একটি বিয়ে বাড়িতে বাজাতে এসেছিলেন তিনি। সেখানেই রাত সাড়ে আটটার দিকে ছেলে ভূমিষ্ঠ হওয়ার খবর পান তিনি। আজ শুক্রবার রাতে (২৭ ফেব্রুয়ারি) ছেলেকে দেখতে যাওয়ার কথা রয়েছে।

রাসেল তালুকদার বলেন, ‘আমার শ্বশুর বাড়ি সাতক্ষীরাতে। সেখানেই ছেলের জন্ম হয়েছে। ছেলে হওয়ার খবরটা শুনে খুবই খুশি হয়েছি। ইচ্ছে হচ্ছিল তখনই ছেলের কাছে ছুটে যাই। ইচ্ছে থাকলেও উপায় নেই। বিয়ে বাড়ির লোকজন আমাদের টাকা দিয়ে ভাড়া করে এনেছে। আমি চলে গেলে বিয়ে বাড়ির আনন্দ হবে না। তাই এত লোকের আনন্দের কথা চিন্তা করে ইচ্ছা থাকলেও ছেলের কাছে যেতে পারিনি।’

আলাপচারিতায় তিনি জানালেন, তাঁদের অভাবের সংসার। বাবা সার্কাসের ম্যানেজারী করতেন। ছোট বয়সেই তিনি যোগ দেন সার্কাস দলে। দেখাতেন শারীরিক কসরতের খেলা। সেখানে ‘ড্রামসেট’ বাজানোর প্রতি আগ্রহ জন্মে। একদিন-দুইদিন শিখতে শিখতে বাজানোটা রপ্ত করে ফেলেন। তারপরে শেখেন অক্টোপ্যাড বাজানো। সেটা কেনার টাকা ছিল না তাঁর কাছে।

বড় বোনকে বিষয়টা জানাতেই কিছু গহনা তুলে দিলেন ছোট ভাইয়ের হাতে। সেটা বন্ধক রেখেই কেনা হলো প্যাড। এখনও সেটাই বাজান রাসেল। তিনি আরও জানালেন, সার্কাস দলেই বেশি বাজান তিনি। সার্কাস দলের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে বেড়ান তিনি। এখন মেলা নেই। তাই বিয়ে বাড়িতে বাজাতে এসেছেন। সার্কাস ছাড়াও গায়ে হলুদ, বিয়ে বাড়ি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বাউল গান, বিচ্ছেদ গানসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ডাক পড়লেই ছুটে যান।

তিনি বলেন, আমাদের জীবনটাই এইরকম। মানুষকে আনন্দ দিতে গিয়ে নিজের আনন্দটাই আর করা হয় না। মানুষের আনন্দটাকে নিজের আনন্দ মনে করতে হয়। এই অনুষ্ঠানে বাজানোর জন্য টাকা নিয়েছি, জবান যখন দিয়েছি তখন বাজাতে আসতেই হবে। এটাই আমার কর্ম। কর্ম করেই খেতে হবে। তাই বাজাতে চলে এসেছি।

রাসেলের সঙ্গে কী বোর্ড বাজাচ্ছিলেন আনন্দ কুমার। তিনি বললেন, ‘রাসেল ছেলে হওয়ার খবরটা শোনার সঙ্গে আমাকে জানিয়েছে। খবরটা শুনে আমিও খুশি হয়েছি। অনুষ্ঠান শেষ করেই ছেলের কাছে যেতে বলেছি।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *