এস এম আব্দুর রহমান, পুঠিয়া : রাজশাহীর পুঠিয়ায় মাত্র অর্ধকাঠা জমিকে ঘিরে রক্তের সম্পর্ক এখন আদালত, থানার অভিযোগ আর পাল্টাপাল্টি দাবির জটিল লড়াইয়ে আটকে গেছে। যে জমির দলিল একবার সম্পন্ন হয়েছিল ২০১৬ সালে, অভিযোগ সেই একই জমি আবারও ২০২৩ সালে অন্য এক ব্যক্তির নামে বিক্রি করা হয়েছে। আর সেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন ফুফু ও ভাতিজা।
শুক্রবার (১০ জুলাই) সকালে বানেশ্বর প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সুফিয়া বেগম ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেন, ২০১৬ সালে জমির মালিক মানিকের কাছ থেকে অর্ধকাঠা জমি ক্রয় করে বৈধভাবে রেজিস্ট্রি করেন সুফিয়া বেগম। কিন্তু সাত বছর পর, ২০২৩ সালে, একই জমি মানিক আবার বিক্রি করেন সুফিয়ারই ভাই আলমের ছেলে সুজনের কাছে। এরপর থেকেই জমির মালিকানা নিয়ে শুরু হয় বিরোধ, যা সময়ের সঙ্গে রূপ নেয় সংঘর্ষ, মামলা ও পাল্টা অভিযোগে।
সংবাদ সম্মেলনে সুফিয়া বেগমের পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন তাঁর পুত্রবধূ মুক্তি খাতুন।
লিখিত বক্তব্যে অভিযোগ করা হয়, জমির দখলকে কেন্দ্র করে সুফিয়া বেগম ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের ওপর একাধিকবার হামলা চালানো হয়েছে। মিথ্যা মামলায় জড়ানো, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেন তাঁরা।
সুফিয়া বেগম বলেন, তাঁর মা জীবদ্দশায় সন্তানদের মধ্যে সম্পত্তি ভাগ করে দিয়েছিলেন। মায়ের নামে থাকা তিন কাঠা জমিই ছিল তাঁর শেষ সম্বল। কিন্তু অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে কৌশলে সেই সম্পত্তি আত্মসাতের চেষ্টা করা হয়েছে। তিনি বলেন, "আমি আমার বৈধভাবে কেনা জমি ফেরত চাই। একই সঙ্গে হামলা ও হুমকির সুষ্ঠু বিচার চাই।"
মুক্তি খাতুন অভিযোগ করেন, গত ১০ জুন বাড়িতে নির্মাণকাজ চলাকালে জমির পাশের কাঁটা সরাতে গেলে প্রতিপক্ষ বাধা দেয়। প্রতিবাদ করলে তাঁদের ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়। হামলায় সুফিয়া বেগমের মাথায় ধারালো অস্ত্রের আঘাত লাগে এবং তাঁর মাথায় একাধিক সেলাই দিতে হয়। পরিবারের অন্য সদস্যদেরও মারধর করা হয় বলে দাবি করেন তিনি।
তাঁর আরও অভিযোগ, হামলার সময় সুফিয়া বেগমের গলায় থাকা প্রায় আট আনা ওজনের স্বর্ণের চেইন ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পাশাপাশি শ্লীলতাহানির চেষ্টা ও প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়।
মুক্তি খাতুন বলেন, ঘটনার পর পুঠিয়া থানায় অভিযোগ দেওয়া হলেও কার্যকর প্রতিকার না পেয়ে তাঁরা আদালতের শরণাপন্ন হন। বর্তমানে জমি-সংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে পুঠিয়া উপজেলা ভূমি অফিসেও একটি মামলা চলমান রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয়, বিরোধের সঙ্গে প্রেমতলী ডিগ্রি কলেজের শিক্ষিকা নুসরাত জাহান বিউটিও জড়িত। তাঁর বিরুদ্ধে আগে প্রকাশিত পারিবারিক নির্যাতনের অভিযোগেরও উল্লেখ করে নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান বক্তারা।
সংবাদ সম্মেলন থেকে হামলার নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা, পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং চলমান মামলাগুলোর সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানানো হয়।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত সুজন। তিনি বলেন, "জমি নিয়ে স্থানীয় চেয়ারম্যানের মাধ্যমে তিনবার সালিস হয়েছে। হোল্ডিং রেকর্ডে ওই জমির কোনো অস্তিত্ব নেই। সুফিয়া বেগম আমার আপন ফুফু। তাঁরাই জোর করে জায়গাটি দখল করতে চাইছেন।"
সুফিয়া বেগমের ওপর হামলার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি। একইভাবে নুসরাত জাহান বিউটির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ নিয়েও তিনি কথা বলতে রাজি হননি।
বানেশ্বর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক দুলাল বলেন, বিষয়টি তাঁকে আগে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। তবে কয়েক দিন আগে সুফিয়া বেগম তাঁর কাছে অভিযোগ তুলে ধরেছেন।
পুঠিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফরিদুল ইসলাম বলেন, "থানায় কেউ আইনি সহযোগিতা চাইলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিষয়টি পারিবারিক ও জমি-সংক্রান্ত বিরোধ। অভিযোগ তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।