তানোরে রাস্তার দু’পাশে হাজারের বেশি তাজা গাছ কর্তন, হুমকিতে পরিবেশ

স্টাফ রিপোর্টার : রাজশাহীর তানোর উপজেলায় রাস্তার দুপাশে সামাজিক বনায়নের আওতায় লাগানো হাজারের অধিক তরতাজা বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। উপজেলার পাঁচন্দর ইউনিয়নের কচুয়া জিতপুর থেকে পাঁচন্দর গ্রাম পর্যন্ত কয়েক কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে এ গাছ কর্তনের ঘটনা ঘটছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ গাছ কাটায় পরিবেশ চরম হুমকিতে পড়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের। কোনো দৃশ্যমান কারণ ছাড়াই বন বিভাগ টেন্ডারের মাধ্যমে এত গাছ কাটায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পরিবেশবিদ ও সচেতন মহল। খরা প্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চল হিসেবে পরিচিত তানোর উপজেলায় যেখানে বেশি বেশি গাছ রোপণের ওপর জোর দিচ্ছে সরকার ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো, সেখানে গাছ কর্তন পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয়দের ভাষ্য, রাস্তার দুপাশের এসব গাছ এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি খরা মৌসুমে পথচারী ও শ্রমজীবী মানুষের জন্য ছিল বিশ্রামের ছায়া। গাছের ডালে বাসা বেঁধে থাকত নানা প্রজাতির পাখি, শোনা যেত পাখির কলরব। গাছ কাটার পর পাখির দেখা মিলছে না, হারিয়ে গেছে স্বাভাবিক পরিবেশ। গাছ থেকে প্রাপ্ত অক্সিজেন থেকেও এখন বঞ্চিত হচ্ছে মানুষ।

তানোর উপজেলার পাঁচন্দর, বাঁধাইড় ও কলমা ইউনিয়নের কিছু অংশ এবং মুন্ডুমালা পৌর এলাকা বরেন্দ্র অঞ্চল ও খরা প্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। এসব এলাকায় খরা মৌসুমে তীব্র তাপপ্রবাহ এবং শীত মৌসুমে বেশি শীত অনুভূত হয়। এ কারণে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এসব এলাকায় অধিক হারে গাছ লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে পরিবেশ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।

উপজেলা বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জেলা বন বিভাগ থেকে ১ হাজার ৫৩টি বিভিন্ন প্রজাতির গাছ নিলামের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়। এসব গাছকে ২১টি লটে ভাগ করা হয়। প্রতিটি লটে ২৫ থেকে ৫০টি পর্যন্ত গাছ অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর মধ্যে ২০টি লটের অর্থ জমা পড়লেও একটি লটের অর্থ জমা না পড়ায় ওই লটের গাছ কাটার কাজ শুরু হয়নি।

ডাসকো ফাউন্ডেশন লোকমর্চা তানোর উপজেলা শাখার সভাপতি অধ্যাপক মফিজ উদ্দিন বলেন, তানোর একটি খরা প্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চল। এখানে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বেশি বেশি গাছ রোপণ করা জরুরি। গাছ রোপণের পরিবর্তে গাছ কাটা মানে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করা। ক্ষতিকর ইউক্যালিপটাস গাছ কাটা যৌক্তিক হতে পারে, কিন্তু অন্য প্রজাতির গাছ কাটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এতদিন আগের নিলামের গাছ এখন কেন কাটা হচ্ছে, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।

উপজেলা বন কর্মকর্তা একেএম সারোয়ার হোসেন জানান, সামাজিক বনায়নের নিয়ম অনুযায়ী গাছ কাটার অর্থের ৫৫ শতাংশ পাবেন উপকারভোগীরা। এখানে উপকারভোগীর সংখ্যা ২৫ জন। ইউনিয়ন পরিষদ পাবে ৫ শতাংশ, রাস্তার মালিক পাবে ২০ শতাংশ, সরকারের রাজস্ব খাতে যাবে ১০ শতাংশ এবং পুনরায় গাছ রোপণের জন্য রাখা হবে ১০ শতাংশ অর্থ। তিনি জানান, কাটা গাছগুলোর মধ্যে ছিল শিশু, নিমজিরি, অর্জুন, আকাশমনি ও ইউক্যালিপটাস। এসব গাছ ২০০৩ ও ২০০৪ সালের দিকে রোপণ করা হয়েছিল।

খরা প্রবণ এলাকায় গাছ কাটা নিষিদ্ধ কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বন বিভাগের নিয়ম অনুযায়ী নিলামের মাধ্যমেই গাছ কাটা হচ্ছে। এছাড়া পদ্মা নদী থেকে বিএমডিএর পানি সরবরাহ প্রকল্পের কারণে খাগরাকান্ত থেকে সাদিপুর পর্যন্ত খালের দুপাশের গাছও দ্রুত কাটা হবে বলে জানান তিনি। তবে ২১টি লটের গাছ কত টাকায় নিলাম হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি কোনো তথ্য দিতে পারেননি।

এদিকে পরিবেশবিদরা আশঙ্কা করছেন, এভাবে একের পর এক গাছ উজাড় হলে বরেন্দ্র অঞ্চলে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব আরও তীব্র হবে এবং পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *