অন্তর্ভুক্তিমূলক ভোটাধিকার বাস্তবায়নে আইটি–সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালট

গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো সর্বস্তরের নাগরিকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। কিন্তু জীবিকা, কর্মসংস্থান কিংবা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের কারণে দীর্ঘদিন ধরে দেশের অভ্যন্তরে ও বাইরে অবস্থানরত নাগরিকদের একটি বড় অংশ বাস্তবে ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত ছিলেন। প্রযুক্তির বিকাশ ও প্রশাসনিক সক্ষমতার সমন্বয়ে সেই দীর্ঘদিনের সীমাবদ্ধতা দূর করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন আইটি–সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।  

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট–২০২৬ সামনে রেখে বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার কার্যকর ও সহজ করতে যুগোপযোগী উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ২৭ অনুচ্ছেদের বিধান অনুসারে কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আসন্ন নির্বাচনে প্রবাসী ভোটাররা আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট প্রদান করতে পারবেন। এ লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন বিদ্যমান পোস্টাল ভোট ব্যবস্থাকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
 
এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে ‘Postal Vote BD’ নামে একটি বিশেষ মোবাইল অ্যাপ প্রস্তুত করা হয়েছে, যার মাধ্যমে বিদেশে অবস্থানরত ভোটাররা অনলাইনে আবেদন করে পোস্টাল ব্যালটে ভোট প্রদানের জন্য নিবন্ধন করতে পারবেন। আবেদনকারী ভোটারদের জাতীয় পরিচয়পত্রসহ প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই শেষে বাংলাদেশ ডাক বিভাগের মাধ্যমে তাদের বিদেশের ঠিকানায় পোস্টাল ব্যালট পাঠানো হবে। প্রতীক বরাদ্দ সম্পন্ন হলে ভোটাররা অ্যাপের মাধ্যমে নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার প্রার্থী তালিকা সম্পর্কে অবহিত হতে পারবেন এবং নির্ধারিত নিয়মে ভোট প্রদান করবেন। ভোট প্রদান শেষে ব্যালট ফেরত পাঠানোর অগ্রগতিও অ্যাপের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা যাবে।
 
নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৮ নভেম্বর ২০২৫ তারিখ থেকে প্রবাসী বাংলাদেশি ভোটাররা সংযুক্ত সিডিউল অনুযায়ী ‘Postal Vote BD’ অ্যাপের মাধ্যমে পোস্টাল ভোটের জন্য নিবন্ধন করতে পারছেন। নিবন্ধন চলবে আগামী ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত।  নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ভোটারকে যে দেশ থেকে ভোট দিতে ইচ্ছুক, কেবলমাত্র সেই দেশের মোবাইল নম্বর ব্যবহার করতে হবে এবং Google Play Store অথবা App Store থেকে অ্যাপটি ডাউনলোড করে ইনস্টল করতে হবে। নিজ ভোটার এলাকার বাইরে অবস্থানরত সরকারি চাকরিজীবীদের ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত, নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিতদের ১৮–২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ এবং আইনি হেফাজতে থাকা ভোটারদের ২১–২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ এর মধ্যে Postal Vote BD অ্যাপে নিবন্ধন করতে হবে।

অ্যাপে প্রবেশ করে ব্যবহারকারী বাংলা বা ইংরেজি যেকোনো একটি ভাষা নির্বাচন করে নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও কাগজপত্র সম্পর্কে জানতে পারবেন। আবেদন প্রক্রিয়ায় OTP, লাইভনেস ও জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই সম্পন্ন করে নিবন্ধন নিশ্চিত করা হবে। ভোটারদের ক্ষেত্রে বিদেশে ব্যালট সঠিকভাবে পৌঁছানোর জন্য নির্ভুল ও পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
 
নিবন্ধন সম্পন্ন হওয়া ভোটারদের কাছে পর্যায়ক্রমে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে পোস্টাল ব্যালট পাঠানো হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভোটাররা তাদের প্রদত্ত ঠিকানায় একটি পোস্টাল প্যাকেজ পাবেন, যেখানে ব্যালট পেপার, ভোট প্রদানের নির্দেশাবলী, ঘোষণাপত্র, ব্যালট রাখার ছোট খাম এবং রিটার্নিং অফিসারের ঠিকানা সংবলিত ফেরত খাম অন্তর্ভুক্ত থাকবে। খাম পাওয়ার পর ভোটাররা অ্যাপে লগইন করে খামের ওপর থাকা QR কোড স্ক্যান করলে সংশ্লিষ্ট ব্যালটটি সিস্টেমে শনাক্ত হবে।
 
ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে ভোটাররা প্রাপ্ত ব্যালট পেপারে মুদ্রিত প্রতীকের পাশে টিক বা ক্রস চিহ্ন দিয়ে ভোট প্রদান করবেন। ভোট দেওয়ার আগে ঘোষণাপত্রে ব্যালট পেপারের ক্রমিক নম্বর, ভোটারের নাম ও জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর উল্লেখ করে স্বাক্ষর করতে হবে। নিরক্ষর বা অক্ষম ভোটারের ক্ষেত্রে অন্য একজন বৈধ ভোটারের সহায়তায় ঘোষণাপত্র পূরণ ও সত্যায়নের বিধান রাখা হয়েছে, যা ছাড়া ব্যালট বৈধ বলে গণ্য হবে না।
 
ভোট চিহ্নিত করার পর শুধুমাত্র ব্যালট পেপারটি নির্ধারিত ছোট খামে ভরে সেটি বন্ধ করতে হবে এবং পরে স্বাক্ষরিত ঘোষণাপত্রসহ রিটার্নিং অফিসারের ঠিকানা মুদ্রিত ফেরত খামে প্রবেশ করিয়ে ডাকযোগে পাঠাতে হবে। এই ডাক প্রেরণের জন্য ভোটারকে কোনো মাশুল প্রদান করতে হবে না, কারণ সম্পূর্ণ ব্যয় সরকার বহন করবে। পোস্টাল ভোট গণনা শুরুর পূর্ব পর্যন্ত রিটার্নিং অফিসারের কাছে পৌঁছানো ব্যালটই কেবল গণনার আওতায় আসবে।
 
এদিকে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট–২০২৬ উপলক্ষে দেশে অবস্থানরত কিন্তু নিজ ভোটার এলাকার বাইরে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং আইনি হেফাজতে থাকা ভোটারদের জন্য ইন-কান্ট্রি পোস্টাল ভোট (ICPV) ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে। এই শ্রেণির ভোটারদের আগামী ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখের মধ্যে ‘Postal Vote BD’ অ্যাপে নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে।
 
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিবন্ধনের ক্ষেত্রে iBAS++ সিস্টেম ব্যবহার করে পরিচয় যাচাই করা হবে। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত নিবন্ধন কার্যক্রম চালু থাকবে, কারণ এই সময়ের বাইরে iBAS++ সিস্টেম বন্ধ থাকে। নির্বাচন কমিশন সরকারের সকল মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অধিদপ্তরকে তাদের অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পোস্টাল ভোটে নিবন্ধনের বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করতে এবং বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচারের নির্দেশনা দিয়েছে।
 
যেকোনো নির্বাচনী ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে এর স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তার ওপর। আইটি–সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালট পদ্ধতিতে ভোটার পরিচয় যাচাইয়ে বায়োমেট্রিক বা ডিজিটাল অথেনটিকেশন ব্যবহারের সুযোগ থাকায় প্রকৃত ভোটার ছাড়া অন্য কারও পক্ষে ব্যালট গ্রহণ বা ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। প্রতিটি পোস্টাল ব্যালটে ইউনিক কিউআর কোড সংযুক্ত থাকায় ব্যালটের প্রিন্টিং থেকে শুরু করে ডাকযোগে পাঠানো, গ্রহণ এবং গণনার প্রতিটি ধাপ ট্র্যাক করা যায়। এর ফলে ব্যালট হারানো, বদলানো বা অননুমোদিতভাবে ব্যবহার করার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। পুরো প্রক্রিয়াজুড়ে এনক্রিপশন ও আধুনিক ডেটা সুরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োগ করায় ভোটারের ব্যক্তিগত তথ্য ও ভোটের গোপনীয়তা অক্ষুণ্ণ থাকে।
 
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ৫ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি ভোটার পোস্টাল ভোটের জন্য নিবন্ধন করেছেন। এর মধ্যে বিপুল অংশ প্রবাসী বাংলাদেশি, যাদের মধ্যে সৌদি আরব, কাতার, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত ভোটারদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি নিজ ভোটার এলাকার বাইরে অবস্থানরত সরকারি চাকরিজীবী ও নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তারাও এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হচ্ছেন। এই সংখ্যা কেবল প্রযুক্তির গ্রহণযোগ্যতাই তুলে ধরে না, বরং প্রবাসী ও কর্মজীবী নাগরিকদের দীর্ঘদিনের ভোটাধিকার প্রয়োগের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
 
এ পর্যন্ত ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে ২১ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত মোট ৫ লাখ ৭৫ হাজার ৬১৭ জন ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন সম্পন্ন করেছেন। এর মধ্যে ৫ লাখ ৩৯ হাজার ১১১ জন পুরুষ এবং ৩৬ হাজার ৫০৪ জন নারী ভোটার রয়েছেন, যা প্রবাসী ও কর্মজীবী ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণের একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। দেশভিত্তিক নিবন্ধনের হিসাবে সৌদি আরব থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৩৮ হাজার ৭১৭ জন প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন করেছেন। এর পরের অবস্থানে রয়েছে কাতার, মালয়েশিয়া, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি, কানাডা, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়াসহ একাধিক দেশ।
 
ব্যয় ও বাস্তবায়নের দিক থেকেও পোস্টাল ভোটিং একটি তুলনামূলক সাশ্রয়ী ব্যবস্থা হিসেবে সামনে এসেছে। ইন–কান্ট্রি পোস্টাল ভোটিংয়ে একজন ভোটারের জন্য খরচ পড়বে মাত্র ২২ টাকা, অন্যদিকে প্রবাসী ভোটারদের ক্ষেত্রে এই খরচ গড়ে প্রায় ৭০০ টাকা বলে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। নির্বাচন কমিশন শুরুতে পোস্টাল ব্যালটে নিবন্ধনের প্রাথমিক লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল ১০ লাখ ভোটার। বর্তমান নিবন্ধনের ধারা অব্যাহত থাকলে এই সংখ্যা ৫ থেকে ৬ লাখে পৌঁছাতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প কর্তৃপক্ষ আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। 

প্রযুক্তিনির্ভর যাচাই, স্বচ্ছ ট্র্যাকিং ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের মাধ্যমে পরিচালিত এই পদ্ধতি প্রবাসী ও দেশে অবস্থানরত কিন্তু নিজ ভোটার এলাকার বাইরে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত বেসামরিক ভোটারদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার বাস্তব প্রতিফলন ঘটিয়েছে। নিবন্ধনের পরিসংখ্যান ও অংশগ্রহণের প্রবণতা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ সহজ হলে নাগরিকরা তা গ্রহণ করতে আগ্রহী।

লেখক: মোঃ খালিদ হাসান
সহকারী তথ্য অফিসার, তথ্য অধিদফতর 
পিআইডি ফিচার 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *